আজকাল ইন্টারভিউ বোর্ডে বা কোনো আড্ডায় যখন আমাদের দেশের কোনো তরুণকে হঠাৎ কেউ ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে—“What do you think about this?”

তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। ছেলেটির মাথায় চমৎকার সব ভাবনা আছে। সে কিন্তু বোকা নয়। কিন্তু কথা যেন কিছুতেই মুখ পর্যন্ত আসছে না। সে তখন ছটফট করে, ঘামতে থাকে।

এই মুহূর্তটাকে আমরা সাধারণত বলি ‘কনফিডেন্সের অভাব’। কিন্তু আমি বলব, এটা মেধার বা সাহসের অভাব নয়। এটা আসলে আমাদের শেখার পদ্ধতির গলদ।

দোষটা আমাদের নয়, দোষটা আমাদের পুরনো জং ধরা সিস্টেমের।

৩,০০০ ঘণ্টার এক গোলকধাঁধা

হিসাব করে দেখা গেছে, স্কুল থেকে কলেজ শেষ করতে করতে আমরা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ ঘণ্টা ইংরেজির ক্লাস করি।

৩,০০০ ঘণ্টা কিন্তু মুখের কথা নয়! এতক্ষণে একটা মানুষ চমৎকার গিটার বাজানো শিখে যেতে পারে, কম্পিউটারের জটিল কোডিং শিখে ফেলতে পারে, এমনকি যেকোনো খেলায় দারুণ অপেশাদার খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে এত বছর ধরে গ্রামারের রুল মুখস্থ করে, পরীক্ষায় গাদা গাদা নম্বর পেয়েও কেন আমরা দুটো কথা বলতে গেলে ফ্রিজ হয়ে যাই?

ভুলটা আসলে গোড়াতেই। আমরা ইংরেজিকে কেমিস্ট্রি বা হিস্ট্রির মতো একটা ‘বিষয়’ ধরে নিয়েছি। আমাদের ধারণা—নিয়ম, সংজ্ঞা আর ফর্মুলা মাথায় জমিয়ে রাখলেই ভাষা শেখা হয়ে যায়।

ভাষা কোনো মুখস্থ বিদ্যার বিষয় নয়। ভাষা হলো সাইকেল চালানোর মতো একটা কৌশল, একটা স্কিল।

সাইকেল চালাতে গিয়ে আমরা কি কখনো মাথায় ফিজিক্সের হিসাব করি? হ্যান্ডেল কত ডিগ্রি বাঁকাতে হবে, চাকার গতি কত হতে হবে—এসব ভাবি? ভাবি না। আমাদের শরীর বারবার পড়ে গিয়ে, ধাক্কা খেয়ে, একটু ডানে-বাঁয়ে হেলে নিজে থেকেই ব্যালেন্সটা শিখে নেয়। একসময় পুরো ব্যাপারটা হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়।

যে মানুষটা অনায়াসে ইংরেজি বলে, সে কিন্তু মনের ভেতর সাবজেক্ট, ভার্ব আর অবজেক্ট মেলাতে বসে না। সে শুধু বলে যায়। কারণ, ইংরেজির নকশাটা তার ব্রেনের ভেতরে এতবার চলেছে যে সেটা একদম পানির মতো সহজ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞানের ভাষায় এর দুটো সুন্দর নাম আছে:

  • জানার জ্ঞান (Declarative Knowledge): যেমন সাইকেলের ফিজিক্স জানা, কিংবা পাস্ট টেন্সের নিয়ম মুখস্থ থাকা।
  • করার জ্ঞান (Procedural Knowledge): যেমন সরাসরি সাইকেলে উঠে প্যাডেল করা, কিংবা নিজের ভাবনাটা মুখে প্রকাশ করা।

আমাদের ক্লাসরুমগুলো আমাদের প্রথমটা শেখায়, কিন্তু দ্বিতীয়টার কোনো সুযোগই দেয় না। তারা ভাবে, নিয়ম মুখস্থ করালেই বুঝি একদিন মুখ দিয়ে অনর্গল ইংরেজি খইয়ের মতো ফুটবে।

সেটা আসলে কোনোদিনও হয় না।

কেন এই গরমিল? তিনটি মূল কারণ

আমাদের ব্রেনের এই সাইকেলটা মাঝপথে এসে চেইন ড্রপ করার পেছনে মূলত তিনটি কারণ আছে।

১. আমরা সাইকেল চালানোর বই পড়ি, কিন্তু চালানোর চেষ্টা করি না

আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি পুরস্কার দেয় কোন জিনিসে? গ্রামারের শূন্যস্থান পূরণ করা, প্যারাগ্রাফ মুখস্থ লেখা আর বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করা।

এই ট্রেনিং দিয়ে বড়জোর ইংরেজি পরীক্ষার খাতা ভরা যায়, কিন্তু রক্তমাংসের একটা মানুষের সাথে কথা বলা যায় না। কারণ, মুখোমুখি কথা বলার নিয়মটা একদম আলাদা:

পরীক্ষার খাতায়মুখোমুখি কথায়
মুখস্থ করা স্ক্রিপ্ট থাকেকোনো স্ক্রিপ্ট থাকে না
ভেবে লেখার সময় পাওয়া যায়চিন্তা করার সময় পাওয়া যায় না
ভুল এড়ালে নম্বর বাড়েভুল না করলে কথাই শুরু করা যায় না

আমরা আসলে ভাষার ম্যানুয়াল বই মুখস্থ করেছি, কিন্তু ইঞ্জিনটা স্টার্ট দিইনি।

২. ইংরেজি আমাদের জীবনের দরকারে লাগে না

আমাদের ব্রেন বড্ড চালাক বস্তু। সে অপ্রয়োজনীয় জিনিস মনে রাখতে চায় না। ভাষা তখনই দ্রুত ডালপালা মেলে, যখন সেটা বেঁচে থাকার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশের মফস্বলে বা শহরে ইংরেজিটা থাকে শুধু খাতার ভেতরে। আমাদের সকালের চা-টা বাংলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা বাংলা, বাজারের দরদাম বাংলা, এমনকি রাগ-অভিমান-প্রেম সবই বাংলা।

ইংরেজি শুধু লাগে পরীক্ষার হলের ওই তিন ঘণ্টার জন্য। পরীক্ষা শেষ, তো ইংরেজির সাথে আমাদের সম্পর্কও শেষ।

যে বাচ্চাটা হঠাৎ করে বিদেশে চলে যায়, সে কিন্তু এক-দেড় বছরের মধ্যে অনর্গল ইংরেজি বলতে শুরু করে। সে কোনো জাদুমন্ত্র জানে না। আসলে ভাষা না বললে সেখানে তার প্রতিদিনের জীবন আটকে যায়।

এই ঠেলাটাই তার ব্রেনকে বদলে দেয়।

৩. ভুল করার তীব্র ভয়

যেকোনো স্কিল তৈরি হয় ভুল করার মধ্য দিয়ে। সাইকেল শিখতে গেলে হাঁটু ছড়ে যাবেই—এটাই নিয়ম।

কিন্তু আমাদের ক্লাসরুম বা সমাজে ভুল করাটা যেন একটা মহাপাপ! ইংরেজি বলতে গিয়ে একটা শব্দ ভুল হলেই চারপাশের মানুষ হা হা করে হেসে ওঠে, শিক্ষকরা ধমক দেন। ফলে আমাদের ব্রেন একটা উল্টো জিনিস শিখে নেয়: “খবরদার! নিশ্চিত না হয়ে মুখ খুলবে না।”

এই ভয়ের চোটে আমরা ইংরেজি বলতে শেখার আগেই ইংরেজিকে ভয় পেতে শিখে যাই।

দক্ষতার এক মস্ত বিভ্রম (Illusion of Competence)

এখানে একটা মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ আছে। পরীক্ষায় যখন আমরা ৭৮, ৮৫ কিংবা এ-প্লাস পাই, আমরা মনের সুখে ধরে নিই: “বাহ্! আমি তো ইংরেজি বেশ ভালোই পারি।”

এই এ-প্লাস পাওয়াটা কিন্তু মিথ্যা নয়, তবে এটা একটা বিভ্রম। এটা প্রমাণ করে আমরা পরীক্ষার নির্দিষ্ট ছকটা মেলাতে পারি, কিন্তু এটা গ্যারান্টি দেয় না যে আমরা সাইকেলটা চালাতে পারি।

আমাদের মাথায় ইংরেজি সম্পর্কে অনেক তথ্য ভরা হয়েছে, কিন্তু মুখে চাকা ঘোরানোর ট্রেনিং দেওয়া হয়নি।

শেষ কথা

তাহলে ৩,০০০ ঘণ্টা ক্লাস করেও আমরা কেন বলতে পারি না? আমরা বোকা বলে? একদমই না।

আসল কারণটা খুবই যান্ত্রিক।

আমরা সাইকেলের মেকানিক্স পড়েছি, কিন্তু সাইকেলের সিটে বসা হয়নি।

আর কোনো একটা পদ্ধতি যদি বছরের পর বছর একই ব্যর্থ ফলাফল দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে সমস্যা মেধার নয়, সমস্যা পদ্ধতির।

পরের লেখায় আমরা দেখব, এই জং ধরা মেকানিজম থেকে বের হয়ে আমাদের ব্রেনের আসল রূপান্তরটা কীভাবে ঘটানো যায়।

চাইলে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন।