১৬ বছর ইংরেজি পড়েও কেন আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারি না?

Education PhilosophyJuly 22, 20265 min read

আপনি যদি বাংলাদেশে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে থাকেন, তাহলে সম্ভবত আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল শিক্ষাগত স্ক্যাম গুলোর একটির অংশ ছিলেন।

একবার ভেবে দেখুন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ইংরেজি বই হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের দিন পর্যন্ত—প্রায় ১২, ১৪, এমনকি ১৬ বছর ধরে আমরা ইংরেজি পড়ি।

হাজার হাজার শব্দ মুখস্থ করি। অসংখ্য ব্যাকরণের নিয়ম শিখি। বছরের পর বছর পরীক্ষা দিই।

কিন্তু এত কিছুর পরেও যদি ঢাকার রাস্তায় কোনো বিদেশি এসে একজন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটকে জটিল কোনো রাস্তার দিকনির্দেশনা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে, তাহলে কী হয়?

বেশিরভাগ মানুষ থমকে যায়।

হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।

মাথা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।

কয়েকটি ভাঙা-ভাঙা শব্দ বলার চেষ্টা করে, তারপর কোনোভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।

প্রশ্ন হলো—এটা কীভাবে সম্ভব?

একজন মানুষ যদি ১৬ বছর ধরে একটি বিষয় শেখে, তাহলে বাস্তবে সেটি ব্যবহার করতে না পারার কারণ কী?

ভাবুন, কেউ যদি ১৬ বছর ধরে গাড়ি চালানো শেখে, তবুও লেন পরিবর্তন করতে গিয়ে প্রতিবার দুর্ঘটনা ঘটায়—তাহলে কি আমরা ড্রাইভারকে দোষ দেব?

না।

আমরা অবশ্যই সেই ড্রাইভিং স্কুলের শেখানোর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলব।

ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে।

কেন পুরো একটি প্রজন্ম ইংরেজিতে কথা বলতে সমস্যায় পড়ছে, সেটা বুঝতে হলে শুধু শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নয়—মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে শেখে, সেটিও বুঝতে হবে।

সমস্যার শুরু: Grammar-Translation Method

মনোবিজ্ঞানে স্মৃতিকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

১. Declarative Memory (তথ্যভিত্তিক স্মৃতি)

এখানে আমরা তথ্য, সূত্র, নিয়ম, সংজ্ঞা, তারিখ—এসব সংরক্ষণ করি।

যেমন—

  • রাজধানীর নাম
  • ইতিহাসের সাল
  • ব্যাকরণের নিয়ম
  • পরীক্ষার উত্তর

এ ধরনের স্মৃতি সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং তুলনামূলক ধীরগতির।

২. Procedural Memory (দক্ষতাভিত্তিক স্মৃতি)

এখানে জমা হয় আমাদের অভ্যাস এবং দক্ষতা।

যেমন—

  • সাইকেল চালানো
  • সাঁতার কাটা
  • কীবোর্ডে টাইপ করা
  • গাড়ি চালানো

এগুলো করার সময় আমরা প্রতিটি ধাপ আলাদা করে ভাবি না।

মস্তিষ্ক নিজেই কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে ফেলে।

ভাষা কোন স্মৃতিতে থাকে?

সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলার ক্ষমতা Procedural Memory-এর অংশ।

কোনো নেটিভ স্পিকার কথা বলার সময় মনে মনে Tense হিসাব করে না।

সে Subject, Verb, Object গুনে দেখে না।

তার মস্তিষ্ক বহু বছরের অভ্যাস থেকে স্বাভাবিকভাবে বাক্য তৈরি করে।

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী করে?

ইংরেজিকে একটি দক্ষতা (Skill) হিসেবে না দেখে একটি তথ্যভিত্তিক বিষয় (Theory Subject) হিসেবে পড়ায়।

আমরা বছরের পর বছর মুখস্থ করি—

  • Present Perfect Continuous Tense
  • Voice Change
  • Narration
  • Synonym
  • Antonym

পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সেগুলোর বেশিরভাগই ভুলে যাই।

ফলে মস্তিষ্ক পরীক্ষার জন্য ইংরেজি বুঝতে শিখে,

কিন্তু বাস্তবে ইংরেজিতে কথা বলার জন্য যে নিউরাল সংযোগ (Neural Pathway) তৈরি হওয়া দরকার, সেটি কখনোই তৈরি হয় না।

অর্থাৎ—

আমরা ভাষাটিকে মস্তিষ্কের ভুল অংশে সংরক্ষণ করি।

আমাদের মস্তিষ্ক আসলে কীভাবে ভাষা শেখে?

একটি নবজাতক শিশু পৃথিবীর যেকোনো ভাষার সব ধরনের শব্দ (Sound) আলাদা করে শুনতে পারে।

অর্থাৎ, জন্মের সময় তার মস্তিষ্ক সব ভাষার জন্য প্রস্তুত থাকে।

কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক একই সঙ্গে খুবই দক্ষ শক্তি-সাশ্রয়ী একটি যন্ত্র।

এটি সব সময় হিসাব করে—

"আমি কোন শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি শুনছি?"

যদি একটি শিশু সারাক্ষণ বাংলা শুনে বড় হয়,

তাহলে তার মস্তিষ্ক বুঝে যায়—

"এই শব্দগুলোই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।"

এরপর ধীরে ধীরে অন্য ভাষার শব্দ চেনার জন্য থাকা অনেক নিউরাল সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়।

এটিকে বলা হয় Statistical Learning

অর্থাৎ মস্তিষ্ক বারবার শোনা তথ্যের উপর ভিত্তি করে নিজেকে সাজিয়ে নেয়।

এখন ভাবুন আমাদের ক্লাসরুমের কথা।

শিক্ষক ইংরেজি ব্যাকরণ পড়াচ্ছেন—

কিন্তু ব্যাখ্যা করছেন পুরোটা বাংলায়।

ফলে শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক কোন ভাষাটাকে বেশি গ্রহণ করছে?

বাংলা।

ইংরেজি শব্দগুলো তখন মস্তিষ্কের কাছে মূল তথ্য নয়, বরং আলাদা কিছু বিচ্ছিন্ন শব্দ মাত্র।

ফলে ইংরেজি ভাষার প্রকৃত ধরণ শেখার জন্য যে হাজার হাজার ঘণ্টার বাস্তব ইংরেজি শোনা দরকার,

সেটি কখনোই হয় না।

"লোকে কী বলবে?" — সবচেয়ে বড় মানসিক বাধা

ধরুন একজন শিক্ষার্থী কোনোভাবে সাহস করে ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করল।

ঠিক তখনই আরেকটি বড় বাধা সামনে আসে।

এটিকে ভাষাবিজ্ঞানী Stephen Krashen বলেছেন Affective Filter

সহজ ভাষায়—

এটি এমন একটি মানসিক দেয়াল, যা ভাষা শেখাকে আটকে দেয়।

যখন আমরা ভয় পাই,

লজ্জা পাই,

অথবা মনে হয় সবাই আমাকে বিচার করবে,

তখন শরীরে Cortisol নামের একটি স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়।

এই হরমোন মস্তিষ্কের সেই অংশের কাজ কমিয়ে দেয়, যেটি ভাষা ব্যবহার এবং নতুন তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে।

আমাদের সমাজে অনেকেই ইংরেজি বলতে গিয়ে ভুল করলে—

  • হাসাহাসি করে,
  • উচ্চারণ নিয়ে মজা করে,
  • ছোট করে দেখে।

ফলে মানুষের মনে সব সময় একটি প্রশ্ন ঘোরে—

"লোকে কী বলবে?"

এই ভয় এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে মস্তিষ্ক কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করে।

কিন্তু ভাষা একটি দক্ষতা (Skill)।

দক্ষতা কখনো শুধু পড়ে শেখা যায় না।

অনুশীলন ছাড়া যেমন সাইকেল চালানো শেখা যায় না,

তেমনি কথা না বলে কোনো ভাষায় সাবলীল হওয়াও সম্ভব নয়।

চুপ থাকা মানেই ভাষা শেখার গতি থেমে যাওয়া।

তাহলে সমাধান কী?

বাংলাদেশে ইংরেজি শেখার এই ব্যর্থতা মানুষের মেধার সমস্যা নয়।

এটি একটি ভুল শেখানোর পদ্ধতির স্বাভাবিক ফল।

আমরা এতদিন ধরে পানিতে না নেমে,

পানির উপর লেখা বই পড়ে সাঁতার শেখার চেষ্টা করেছি।

১. নিখুঁত ইংরেজির চেয়ে যোগাযোগকে গুরুত্ব দিন

ভুল হবে।

ব্যাকরণ ঠিক নাও হতে পারে।

উচ্চারণও হয়তো নিখুঁত হবে না।

তবুও কথা বলুন।

কারণ—

ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলা, একদম চুপ থাকার চেয়ে হাজার গুণ ভালো।

২. নিয়ম মুখস্থ করার বদলে বেশি ইংরেজি শুনুন

শুধু Grammar বই পড়ে সাবলীল হওয়া যায় না।

বরং—

  • সিনেমা দেখুন
  • Podcast শুনুন
  • YouTube ভিডিও দেখুন
  • বাস্তব কথোপকথন শুনুন

মস্তিষ্ককে যত বেশি বাস্তব ইংরেজি শোনাবেন,

তত দ্রুত এটি ভাষার প্যাটার্ন চিনতে শুরু করবে।

৩. এমন পরিবেশ তৈরি করুন যেখানে ভুল করা স্বাভাবিক

বন্ধুদের নিয়ে একটি ছোট Speaking Group তৈরি করুন।

অনলাইন Zoom Club করুন।

এমন পরিবেশে অনুশীলন করুন যেখানে কেউ ভুল নিয়ে হাসবে না।

বরং ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে।

কারণ প্রতিটি ভুলই আসলে মস্তিষ্কে নতুন সংযোগ তৈরির একটি ধাপ।

শেষ কথা

মানুষের মস্তিষ্ক যে কোনো বয়সেই নতুন ভাষা শিখতে পারে।

কিন্তু একটি শর্ত আছে।

আমাদের ইংরেজিকে শুধু পরীক্ষায় পাস করার বিষয় হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।

ইংরেজিকে একটি জীবন্ত ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

যেদিন আমরা ইংরেজিকে বইয়ের পাতায় বন্দী না রেখে প্রতিদিনের জীবনের অংশ বানাতে পারব,

সেদিনই ১৬ বছরের সেই ভ্রম ভেঙে যাবে।